বাঁশখালী জনপদ সত্যপ্রকাশে আপোষহীন

বিজ্ঞাপন দিয়ে সাথে থাকুন

test

আজ ঐতিহাসিক ভয়াল ২৯ এপ্রিল! ১২হাজার লাশের মৃত্যুপুরী বাঁশখালী


আজ ঐতিহাসিক ভয়াল ২৯ এপ্রিল! ১২হাজার লাশের মৃত্যুপুরী বাঁশখালী, ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল|


শিব্বির আহমদ রানাঃ ২৮ বছর পেরিয়েও চট্টগ্রাম উপকুলীয় অঞ্চলের মানুষের স্বজন হারানোর আহজারী থামেনি আজোও। বাঁশখালী উপকূলের হতভাগ্যরা এখনো বুঝে পায়নি স্বপ্নের টেকসই বেড়ীবাঁধ। নিত্য প্রাকৃতিক দূর্যোগের শিকার উপকূলবাসী থাকে নানা শংকায়। বেড়ীবাঁধ না থাকায় উপকূলের মানুষজন প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়ে হারাচ্ছে মাথাগুজে থাকার একমাত্র ভিটেমাটি। কারো কারো ভিটে সমুদ্রের অতলে হারিয়েগেছে বহু আগে। উপকূলীয় অঞ্চলের স্বপ্নের বেঁড়ীবাধ আজোও স্বপ্নের মতো অধরাই থেকে গেল। বেঁড়ীবাধ সংস্কারের কাজ বুঝে পায়নি উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজন। বর্ষায় ডুবে, প্রাকৃতিক সাইক্লোন, বন্যায় তাদের হারাতে হয় বেঁচে থাকার নানা ফসলি জমি ও লবনের মাঠ। প্রাকৃতিক দূর্যোগের ভয়াবহ সংকটের কথা মনে করে তারা আৎকে উঠে।

আজ ঐতিহাসিক ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। ভয়াল একটি রাত! এদিন ‘ম্যারি এন’ নামক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় লণ্ডভণ্ড করে দেয় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় পূরো উপকূলীয় অঞ্চল। লাশের পরে লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল চারদিকে। নদী-নালা, ডোবায়, খাল-বিল, সমুদ্রে ভেসেছিল মানুষের লাশ আর লাশ। গরু, মহিষ, ভেড়ার মরদেহের স্তুপ যেনো ভয়াল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়েছিল। দেশের মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিল প্রকৃতির করুণ এই আঘাতের নিদারুণ দৃশ্য। প্রাকৃতিক দূর্যোগের এতোবড় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি এদেশের মানুষ এর আগে আর কখনো সম্মুখীন হয়নি। পরদিন বিশ্ববাসী অবাক হয়ে গিয়েছিল সেই ধ্বংসলীলা দেখে। কেঁপে উঠেছিল বিশ্ব বিবেক। নির্বাক হয়ে থাকিয়ে ছিলো জাতী। স্বজন হারানোর অস্থিরতায় বোবা কান্নায় ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিলো সমগ্রদেশের বিবেক।

বাংলাদেশে আঘাত হানা ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে নিহতের সংখ্যা বিচারে পৃথিবীর ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড় গুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল রাতে বাংলাদেশে-র দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানা এ ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়টিতে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘন্টায় প্রায় ২৫০ কিমি (১৫৫ মাইল/ঘন্টা)। ঘূর্ণিঝড় এবং তার প্রভাবে সৃষ্ট ৬ মিটার (২০ ফুট) উঁচু জলোচ্ছ্বাসে আনুমানিক ১ লক্ষ ৩৮ হাজার মানুষ নিহত এবং প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। গড়ে পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৮০ টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়, কিন্তু যে অল্প সংখ্যক ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানে ভয়াবহ ক্ষতি সাধন করে তার একটি ১৯৯১ সালের ঘুর্ণিঝর 'ম্যারি এন'। বাংলাদেশ তথা উত্তর ভারত মহাসাগর এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয় না। তার পরিবর্তে, আরব সাগর এলাকায় উৎপন্ন ঝড়গুলোকে A এবং বঙ্গোপসাগরে উৎপন্ন ঝড়গুলোকে B অক্ষর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৯১ সালের ২৯ শে এপ্রিল যে ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশে আঘাত হেনেছিল তার পরিচয় TC-02B হিসেবে, তার মানে এটি ছিল ১৯৯১ সালে বঙ্গোপসাগরে উৎপন্ন দ্বিতীয় ঘূর্ণিঝড়।

১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল ভয়ংকর এই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক লক্ষ আটত্রিশ হাজার লোক নিহত হয়েছিল এবং চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। ‘ম্যারি এন’ নামে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় আর এতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় পূরো উপকূল। স্মরণকালের ভয়াবহ এ ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার। ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। সেই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪২ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা আরো বেশি। মারা যায় ২০ লাখ গবাদিপশু। গৃহহারা হয় হাজার হাজার পরিবার। ক্ষতি হয়েছিল ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদ। উপকূলবাসী আজও ভুলতে পারেনি সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি। শতাব্দীর প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বৃহত্তর চট্টগ্রাম এবং দেশের উপকূলীয় অঞ্চল মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয় কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ।


প্রলয়ঙ্করি এই ধ্বংসযজ্ঞের ২৮ বছর পার হতে চলেছে। এখনো স্বজন হারাদের আর্তনাদ থামেনি। ঘরবাড়ি হারা অনেক মানুষ এখনো মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিতে পারেনি। এই ঘুর্ণিঝড়ে বাঁশখালীতে মারা গিয়েছিলেন প্রায় ১২ হাজার মানুষ। এখনো বাঁশখালীর ১৮ কিলোমিটার এলাকায় বেড়িবাঁধেরর কাজ পূর্ণাঙ্গ বুঝে পায়নি। তবে সম্প্রতি শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে উপকূলবাসীর স্বপ্নের বেড়ীবাঁধ। কাজের ধীরগতি, অনুন্নত পাথর ঢালাই, সমুদ্রের তট থেকে কাঁচা বালি নিয়ে নড়বড়ে যৎ সমান্য কাজ হয়েছে বেড়ীবাঁধের। স্থানীয়া জানান, এই বেড়ীবাঁধ যেভাবে হয়েছে তা যেনো তাসেরঘর। অতিবৃষ্টি কিংবা বর্ষার ঢলে, সমুদ্রের জোয়ারের ঢেউয়ে বিলীন হয়ে যেতে পারে। স্থানীয়রা আশংকা করছে, বর্ষার আগেই বেড়ীবাঁধের কাজ পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পন্ন না হলে বন্যায় তলিয়ে যাবে বাঁশখালী উপকুলের প্রেমাশিয়া, খানখানাবাদ, সরল, বাহারছড়া, ইলশা, কদমরসূল, গন্ডামারা-বড়ঘোনা, ছনুয়া সহ সমুদ্র উপকুলের নিম্নাঞ্চল। তাই আতঙ্কে আছেন লক্ষাধিক মানুষ। এ উপজেলার মানুষ এখনো প্রতি বর্ষায় নির্ঘুম রাত কাটান। স্বপ্নের বেড়ীবাঁধ কবে নাগাদ শেষ হবে এমনটাই প্রশ্ন উপকূলবাসীর। বড় বড় পাথর খন্ড গুলো এখনো বসানো হয়নি বেড়ীবাঁধে। টেকসই বেড়ীবাঁধ নির্মানের কাজ বর্ষার আগেই সম্পন্ন করার জন্য স্থানীয়রা সাংসদ মোস্তাফিজুর রহমানের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এই ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় প্রাণহানি হয়েছিলো প্রায় ৮ হাজার লোকের। স্বজন হারানোর বেদনা এখনো ভুলতে পারেনি নিহতের স্বজনেরা। এছাড়াও কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, উখিয়া ও টেকনাফ সহ উপকূলের বিভিন্ন এলার স্বজন হারানো মানুষ গুলো এখনো ভয়াল ২৯ এপ্রিলকে স্বরন করে দুঃসহ বেদনার মধ্যে দিয়ে।



বাঁশখালী জনপদ২৪.কম'র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। যদি কপি করতে হয় তাহলে অনুমতি নিতে হবে অথবা কন্টেন্টের নিচে ক্রেডিট দিয়ে দিতে হবে।


কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.