বাঁশখালী জনপদ সত্যপ্রকাশে আপোষহীন

বিজ্ঞাপন দিয়ে সাথে থাকুন

test

বাঁশখালীতে জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের অগ্রাধিকার ও স্থায়ীত্বশীল পুনর্বাসনের দাবীতে পরামর্শ সভা

জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থায়ীত্বশীল পুনর্বাসনের দাবী- বাঁশখালীতে ইপসার পরামর্শ সভায় বক্তারা

জনপদ ডেস্কঃ লবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্থানচ্যুত মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তা সত্ত্বেও স্থানচ্যুত মানুষের জন্য সাহায্য ও সুরক্ষার পরিমান দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষদের পর্যাপ্ত বাসস্থান ও আশ্রয়স্থল পাবার অধিকার, মানবিক সহায়তা প্রাপ্তির অধিকার, ভূমির অধিকার, খাদ্য, পানি ও পয়:নিষ্কাশনের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সেবার অধিকার, স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার এবং নিজের আবাসস্থল নির্ধারণের অধিকার থাকলেও বঞ্চনার শিকার হতে হয় অসহায় জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষেদের। এর ফলে তারা দারিদ্র্রের দুষ্টচক্রে স্থায়ী ভাবে বাঁধা পড়ছে। এই ধরণের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য সামগ্রিকভাবে স্বেচ্ছার এবং পরিকল্পিত পুনর্বাসন এর বিকল্প নেই যাতে করে তারা ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা থেকে দূরে কোন বসবাসযোগ্য স্থানে বাস করতে পারেন এবং সবরকমের মৌলিক চাহিদা পেতে পারেন।  এর জন্যে তাদের জীবিকা, সম্পত্তি, ভূমি এবং মানবিক অধিকার সমূহের নিশ্চিতকরনও জরুরি।

স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য সংগঠন ইপসার উদ্যোগে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকার জলবায়ু পরিবর্তন জনিত প্রাকৃতিক দুযোর্গে স্থানচ্যুত জনগোষ্ঠী: প্রয়োজন অধিকার ভিত্তিক সম্মিলিত উদ্যোগ বিষয়ক কর্মশালা  ১৫জুলাই বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।

সাংবাদিক কল্যাণ বড়ুয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কর্মশালায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাবা মোমেনা বেগম প্রধান অতিথি হিসেবে তার বক্তব্য প্রদান করেন এবং স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন  ইপসার কর্মসূচি সমন্বয়ক প্রবাল বড়ুয়া এবং ধারনা পত্র উপস্থাপন করেন ইপসার রিসার্চ এন্ড মনিটরিং কর্মকর্তা মোরশেদ হোসেন মোল্লা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আব্দুল মোমিন এবং উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইন্জিনিয়ার মনিরুজ্জামান দেওয়ানজী।

প্রবন্ধ উপস্থাপনে বলা হয় বাঁশখালী উপজেলা বন্যা, সাইক্লোন ও নদীভাঙ্গনের মত আকস্মিক দুর্যোগ এবং উপকূলতটের ক্ষয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি, লবণাক্ত জলের প্রবেশ এবং বৃষ্টিপাতের ধরণ পরিবর্তনের মত ধীরগতির দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। প্রায় ৮০০০ মানুষ জলবায়ুগত পরিবর্তনজনিত স্থানচ্যুতির ফলে এখনো বাঁশখালীর দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় অস্থায়ীভাবে বেড়িবাঁধের আশেপাশে বাস করছে যার ফলে তাদের বারবার আবাসস্থলের জায়গা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। বেড়িবাঁধের সাথে সংযুক্ত জায়গায় বসবাস করছে ৫৪ শতাংশ মানুষ আর ৪০ শতাংশ মানুষের অবস্থান নিকটস্থ বিলের পাশে । নতুন স্থানে ১-৫ বছর ধরে বাস করছে ৫০ শতাংশ মানুষ আর ৬০ শতাংশ মানুষ জীবনে ৩-৫ বার  স্থানচ্যুতির শিকার হয়েছেন। স্থানচ্যুতির ফলে পেশা পরিবর্তন  করতে বাধ্য হয়েছেন ২০ শতাংশ মানুষ। প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের প্রধান পেশা দিনমজুরি আর ২২ শতাংশ মানুষ মৎসজীবি। যদিও স্থানচ্যুত মানষেরা সকলে খাবার পানি টিউবওয়েল থেকে সংগ্রহ করছে কিন্তু আয়রন ও লবনাক্ততার প্রভাবে নিরাপদ সুপেয় পানির সমস্যা উপকূলীয় এলাকায় প্রকট। প্রায় ৯০% শতাংশ মানুষ অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনে অভ্যস্ত যার ফলে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগসহ নানা সংক্রামক রোগে আক্লান্ত হচ্ছে। নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশায় ৬০% শতাংশ মানুষ অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে আগ্রহী কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতায় ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। যদিও দরিদ্র মানুষের জন্য বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন সুরক্ষা ভাতার ব্যবস্থা থাকলেও জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষেরা বঞ্চিত হয় বলে তাদের ক্ষোভ রয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৯৩% মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে স্থানচ্যুতির ফলে কোন ধরণের সাহায্য সহযোগিতা পায়নি।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকি ও অভিযোজন সর্ম্পকিত বেশ কিছু আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করলেও কোনটিতেই জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলার উপায় সমূহ সুস্পষ্টভাবে বিবেচনায় আনা হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের বাসস্থান, ভূমি ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিতকরণে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং নীতিমালা সমূহে যথেষ্ট ঘাটতি ও দুর্বলতা রয়েছে। জলবায়ু স্থানচ্যুতির বিষয়ে কার্যকরী সাড়া প্রদানের জন্য অধিকার ভিত্তিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং সুষ্ঠু প্রয়োগ প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক অনেক আইন ও নীতিমালা ইতোমধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে এবং এ সকল বিদ্যমান আইন ও নীতিমালায় জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা একান্ত জরুরী।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাবা মোমেনা বেগম বলেন বাঁশখালী উপজেলা চট্টগ্রাম জেলার অর্ন্তভূক্ত একটি জলবায়ু দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। এখানে প্রতিটি দুর্যোগের ফলে মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও গৃহহারা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানচ্যুত মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তা স্বত্বেও স্থানচ্যুত মানুষের জন্য সাহায্য সুরক্ষার পরিমাণ প্রয়োজনের তূলনায় অপ্রতুল। এ ধরনের ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের জন্য সামগ্রিক ভাবে স্বেচ্ছা এবং পরিকল্পিত পুনর্বাসন এর বিকল্প নেই যাতে করে তারা ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা থেকে নিরাপদ বসবাসযোগ্য স্থানে বাস করতে পারেন এবং সব রকমের মৌলিক চাহিদা পেতে পারেন। তিনি বাঁশখালীর পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রবাহ জলকদর খালের সংস্কার এবং দখলমুক্তির ব্যবস্থা অচিরেই করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া তিনি বলেন পুকুরিয়া ইউনিয়নের বাস্তুচ্যুত মানুষদের বাস্তবায়নাধীন আশ্রয়ন প্রকল্পে ঘর পাবার ব্যবস্থা, বেড়িবাঁধের সংস্কার, স্থানচ্যুত মানুষেদের তালিকা করা, ভূমিহীন আর স্থানচ্যুত ২৫০ পরিবারের জন্য নতুন আশ্রয়ন প্রকল্প ব্যবস্থা করা এবং দক্ষতা উন্নয়ন মূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে জানান। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডা. মোমিন জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষদের জীবিকা ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ আয়োজনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎে তাদের মনিটরিং করা জরুরী বলে জানান।

ইপসার  সমন্বয়কারী প্রবাল বড়ুয়া আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে ক্ষতিগ্রস্থ সম্প্রদায়ের জন্য বাসস্থান, ভূমি এবং সম্পদের বিষয়ে অধিকার ভিত্তিক সমাধান চিহ্নিতকরন এবং তাদের নিরাপত্তা  নিশ্চিতকরণে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার রক্ষায় সকল পেশার মানুষকে একত্রিত করা, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে খাস জমি প্রদানে অগ্রাধিকার, স্থানচ্যুত মানুষের বর্তমান অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসন কতৃক নিবন্ধনসহ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চয়তকরন, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার, বেড়িবাঁধ সুরক্ষায় উপকূলীয় বনায়ন সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা ভাতার নিশ্চয়তা, আশ্রয়ন ও গুচ্ছগ্রাম সহ অন্যান্য পুনর্বাসন প্রকল্পসমূহে অগ্রাধিকার নিশ্চয়তকরনসহ নিরাপদ খাবার পানির নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন, বিকল্প পেশা, স্থানচ্যুত মানুষের তালিকা প্রস্তুত করা, স্বল্প মূল্যে কৃষি উপকরনসহ বীজ, সার এবং চারা সরবরাহ করার মাধ্যমে জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ হ্রাস করা সম্ভব।

কর্মশালায় অন্যান্য অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উপজেলা দুর্যোগ  ব্যবস্থাপনা  কর্মকর্তা জনাব ুমিঠু কুমার দাশ, দৈনিক প্রথম আলোর উপজেলা প্রতিনিধি হিমেল বড়ুয়া,খানখানাবাদ ইউনিয়েনের ইউপি সদস্য দিদারুল আলম, ব্র্যাকের প্রোগ্রাম অর্গানাইজার মো. মোরশেদ আলম, উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী জনাব লিপটন প্রমুখ।  মতবিনিময় সভায় মতামত প্র্রদান করেন বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারবৃন্দ, স্থানীয় সাংবাদিক ও জলবায়ু জনিত স্থানচ্যুত মানুষের প্রতিনিধি, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধি, স্থানীয় সুশীল শ্রেণীর প্রতিনিধি এবং এনজিও প্রতিনিধিবৃন্ধ।


বাঁশখালীজনপদ২৪.কম'র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। যদি কপি করতে হয় তাহলে অনুমতি নিতে হবে অথবা কন্টেন্টের নিচে ক্রেডিট দিয়ে দিতে হবে।

বাঁশখালীজনপদ২৪.কম' বাঁশখালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সম্পদ-সম্ভার, প্রথা-প্রতিষ্ঠান ও স্থাপত্যশিল্প নিয়ে শেকড় থেকে শিকড়ের অনুসন্ধানে সবসময় সচেতন। বাঁশখালীকে বিশ্বের দরবারে পরিচয় করিয়ে দিতে আমাদের ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। তাই, আমাদের সাথে থাকুন। সব খবর সবসময় সবার আগে পেতে ফেইসবুক পেইজ-এ লাইক দিন।

আপনার মেইল পাঠাতে:
banshkhalijanaphad24@gmail.com




কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.